বিশ্বকোষ, যা সাধারণত ইংরেজিতে “encyclopedia” নামে পরিচিত, একটি ব্যাপক এবং পুঙ্খানুপুঙ্খ তথ্যভাণ্ডার যা বিভিন্ন বিষয়ক সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য সরবরাহ করে। এটি বিভিন্ন শাখার জ্ঞানকে একত্রিত করে এবং বিষয়বস্তুগুলি সাধারণত শিরোনাম অনুসারে সাজানো হয়। বিশ্বকোষগুলি মানব ইতিহাসের শুরু থেকেই বিদ্যমান, যদিও তাদের আধুনিক রূপগুলি প্রযুক্তি এবং তথ্যের সহজলভ্যতার সঙ্গে বদলে গিয়েছে।

বিশ্বকোষের ইতিহাস

বিশ্বকোষের ধারণা প্রাচীন সভ্যতায় শুরু হয়েছিল। প্রথম দিকের উদাহরণগুলির মধ্যে রয়েছে:

১. প্রাচীন মিশর: প্রাচীন মিশরে তথ্য সংগ্রহ এবং সংরক্ষণ করা হতো প্যাপিরাস স্ক্রোলে। এগুলি একটি প্রাথমিক বিশ্বকোষ হিসেবে বিবেচিত হতে পারে, যা বিভিন্ন বিষয়বস্তু সম্পর্কে তথ্য ধারণ করতো।

২. প্রাচীন গ্রিস: এরিস্টটল এবং তার শিষ্যরা জ্ঞান সংগ্রহ এবং বিশ্লেষণের উপর গুরুত্বারোপ করেছিলেন। “পেরিপেটেটিক স্কুল” হিসাবে পরিচিত এই প্রতিষ্ঠানটি বিভিন্ন বিষয়ের উপর লেখালেখি এবং তথ্য সংকলন করতো।

৩. প্রাচীন রোম: প্লিনি দ্য এল্ডার তার “ন্যাচারালিস হিস্টোরিয়া” নামে একটি বৃহৎ কাজ সম্পাদনা করেন, যা একটি প্রাথমিক বিশ্বকোষের উদাহরণ হিসেবে বিবেচিত হয়।

মধ্যযুগীয় বিশ্বকোষ (Medieval Encyclopedias) ছিল জ্ঞান ও তথ্য সংকলনের একটি গুরুত্বপূর্ণ উপায়। মধ্যযুগে, যখন মুদ্রণ প্রযুক্তি এখনও উদ্ভাবিত হয়নি এবং বইগুলি হাতে লিখতে হতো, তখন জ্ঞানের সংকলন ও প্রচারের জন্য বিশেষ ধরণের বইগুলি ব্যবহৃত হতো। এই বইগুলির মধ্যে কয়েকটি উল্লেখযোগ্য বিশ্বকোষের নাম ও বিবরণ দেওয়া হলো:

১. মধ্যযুগীয় বিশ্বকোষ

১. ইসিডোর অফ সেভিলার “এতিমোলজিয়াস”

ইসিডোর অফ সেভিলা (Isidore of Seville) ছিলেন সপ্তম শতকের একজন বিশপ, যিনি “এতিমোলজিয়াস” (Etymologiae) নামে একটি বিশ্বকোষ রচনা করেছিলেন। এটি মধ্যযুগের অন্যতম প্রধান তথ্য সংকলন ছিল এবং বিভিন্ন বিষয়ে প্রায় ২০টি বইয়ের সমন্বয়ে গঠিত ছিল।

২. বেদা ভেনেরাবিলিস এর “দে নাতুরা রেরুম”

বেদা ভেনেরাবিলিস (Bede the Venerable) ছিলেন একজন ইংরেজ ধর্মযাজক এবং পণ্ডিত, যিনি “দে নাতুরা রেরুম” (De Natura Rerum) নামে একটি বিশ্বকোষ রচনা করেছিলেন। এই বইটি প্রধানত প্রাকৃতিক জগত ও মহাবিশ্ব সম্পর্কে তথ্য প্রদান করেছিল।

৩. বার্থলোমিয়াস আংলিকাস এর “ডি প্রোপ্রিয়েটাটিবাস রেরুম”

বার্থলোমিয়াস আংলিকাস (Bartholomeus Anglicus) ছিলেন ১৩ শতকের একজন ফ্রান্সিসকান ফ্রায়ার, যিনি “ডি প্রোপ্রিয়েটাটিবাস রেরুম” (De Proprietatibus Rerum) নামে একটি বিশ্বকোষ রচনা করেছিলেন। এটি ছিল ত্রয়োদশ শতাব্দীর গুরুত্বপূর্ণ একটি তথ্য সংকলন।

৪. ভিনসেন্ট অফ বোভাই এর “স্পেকুলাম মাইউস”

ভিনসেন্ট অফ বোভাই (Vincent of Beauvais) ছিলেন ১৩ শতকের একজন ফ্রান্সিসকান মঠবাসী, যিনি “স্পেকুলাম মাইউস” (Speculum Maius) নামে একটি বিশাল বিশ্বকোষ রচনা করেছিলেন। এই বিশ্বকোষটি তিনটি প্রধান বিভাগে বিভক্ত ছিল: “স্পেকুলাম ন্যাচুরাল”, “স্পেকুলাম হিস্টোরিয়াল”, এবং “স্পেকুলাম ডোক্ট্রিনাল”।

৫. গ্যাজার অফ ক্রেমোনার অনুবাদগুলি

গ্যাজার অফ ক্রেমোনা (Gerard of Cremona) ছিলেন একজন ইতালীয় অনুবাদক, যিনি আরবি থেকে অনেক গুরুত্বপূর্ণ বৈজ্ঞানিক ও চিকিৎসাবিষয়ক গ্রন্থগুলি ল্যাটিনে অনুবাদ করেছিলেন। তার অনুবাদগুলি ইউরোপীয় বিশ্বকোষগুলির উপর ব্যাপক প্রভাব ফেলেছিল।

৬. হাগু গ্রোটেস “ম্যাগনাস লিবার অরাগনিস”

হাগু গ্রোটে (Hugh of St. Victor) ছিলেন একজন দার্শনিক এবং তাত্ত্বিক, যিনি “ম্যাগনাস লিবার অরাগনিস” (Magnum Librum Organon) নামে একটি বিশ্বকোষ রচনা করেছিলেন, যা জ্ঞান ও দর্শনের বিভিন্ন বিষয় আচ্ছাদিত করেছিল।

এই সমস্ত বিশ্বকোষগুলি মধ্যযুগের জ্ঞান, সংস্কৃতি, বিজ্ঞান এবং ধর্মের বিষয়ে মূল্যবান তথ্য প্রদান করেছিল এবং ভবিষ্যৎ গবেষণা ও শিক্ষার জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি স্থাপন করেছিল।

২. আধুনিক যুগের বিশ্বকোষ

আধুনিক যুগের বিশ্বকোষ বিভিন্ন বিষয় ও জ্ঞান সম্পর্কে ব্যাপক ও সামগ্রিক তথ্য সরবরাহ করে। এখানে কিছু গুরুত্বপূর্ণ আধুনিক যুগের বিশ্বকোষের উদাহরণ দেওয়া হলো:

উইকিপিডিয়া (Wikipedia):

  • এটি একটি মুক্ত বিশ্বকোষ যা যেকেউ সম্পাদনা করতে পারে।
  • অনেক ভাষায় উপলব্ধ এবং নতুন ও আপডেটেড তথ্য পাওয়া যায়।

ব্রিটানিকা এনসাইক্লোপিডিয়া (Encyclopaedia Britannica):

  • এটি একটি বিখ্যাত এবং প্রাচীন বিশ্বকোষ, বর্তমানে অনলাইনে উপলব্ধ।
  • বিশুদ্ধ এবং নির্ভরযোগ্য তথ্যের জন্য বিখ্যাত।

এনসাইক্লোপিডিয়া ব্রিটানিকা অনলাইন:

  • এটি ব্রিটানিকা বিশ্বকোষের অনলাইন সংস্করণ।
  • বিভিন্ন বিষয়ে গভীর এবং বিস্তৃত তথ্য প্রদান করে।

গ্যাল পোর্টালস (Gale Virtual Reference Library):

  • এই ডিজিটাল লাইব্রেরিটি বিভিন্ন ধরনের রেফারেন্স বই ও বিশ্বকোষ সরবরাহ করে।
  • শিক্ষার্থী এবং গবেষকদের জন্য উপকারী।

স্ট্যানফোর্ড এনসাইক্লোপিডিয়া অফ ফিলোসফি (Stanford Encyclopedia of Philosophy):

  • এটি দর্শন ও সংশ্লিষ্ট বিষয়গুলির উপর বিশেষভাবে নিবদ্ধ।
  • নিবন্ধগুলি বিশেষজ্ঞদের দ্বারা রচিত এবং পর্যালোচিত।

অক্সফোর্ড রেফারেন্স (Oxford Reference):

  • এটি বিভিন্ন বিষয়ে সংক্ষিপ্ত এবং বিস্তারিত তথ্য সরবরাহ করে।
  • উচ্চ মানের এবং প্রামাণিক তথ্যের জন্য পরিচিত।

আধুনিক যুগের বিশ্বকোষগুলি ইন্টারনেটের মাধ্যমে সহজলভ্য এবং ব্যবহারকারীদের জন্য জ্ঞানের ভাণ্ডার হিসেবে কাজ করে। এগুলি শিক্ষা, গবেষণা এবং সাধারণ জ্ঞান বৃদ্ধির জন্য অত্যন্ত উপকারী।

৩. ডিজিটাল যুগের বিশ্বকোষ

ডিজিটাল যুগের বিশ্বকোষ বলতে একটি এমন তথ্যভাণ্ডারকে বোঝায় যা ডিজিটাল মাধ্যমের সাহায্যে তৈরি এবং ব্যবহৃত হয়। এটি প্রথাগত প্রিন্টেড এনসাইক্লোপিডিয়া বা বিশ্বকোষের ডিজিটাল সংস্করণ। ডিজিটাল যুগের বিশ্বকোষে বিভিন্ন বৈশিষ্ট্য থাকে যা একে প্রথাগত বিশ্বকোষ থেকে আলাদা করে:

বৈশিষ্ট্যসমূহ:

অনলাইন অ্যাক্সেস:

  • যে কোনো সময় এবং যে কোনো স্থান থেকে ইন্টারনেটের মাধ্যমে অ্যাক্সেস করা যায়।
  • সহজে আপডেট এবং সম্পাদনা করা যায়।

ইন্টারঅ্যাক্টিভ কন্টেন্ট:

  • মাল্টিমিডিয়া উপাদান যেমন ছবি, ভিডিও, অডিও ক্লিপ ইত্যাদি অন্তর্ভুক্ত।
  • হাইপারলিঙ্কের মাধ্যমে সম্পর্কিত তথ্যের সাথে সহজেই সংযোগ স্থাপন।

ইউজার জেনারেটেড কন্টেন্ট:

  • ব্যবহারকারীরা নিজেও তথ্য যোগ করতে বা সম্পাদনা করতে পারেন (উইকিপিডিয়ার মত)।
  • ব্যবহারকারীদের মতামত এবং সংশোধনী সহজেই গ্রহণ করা যায়।

অনুসন্ধান ক্ষমতা:

  • দ্রুত এবং কার্যকরীভাবে তথ্য অনুসন্ধান করা যায়।
  • কিওয়ার্ড এবং বিষয়ভিত্তিক অনুসন্ধানের সুবিধা।

আপডেটেড ইনফরমেশন:

  • নিয়মিতভাবে তথ্য হালনাগাদ করা হয়।
  • সাম্প্রতিক ঘটনাবলী ও নতুন তথ্য দ্রুত যোগ করা যায়।

উদাহরণ:

  • উইকিপিডিয়া: এটি সবচেয়ে বড় এবং জনপ্রিয় ডিজিটাল বিশ্বকোষ। বিশ্বজুড়ে ব্যবহারকারীদের সহায়তায় তৈরি এবং সম্পাদিত হয়।
  • ব্রিটানিকা অনলাইন: প্রথাগত এনসাইক্লোপিডিয়া ব্রিটানিকার ডিজিটাল সংস্করণ।
  • এনসাইক্লোপিডিয়া অফ লাইফ: জীববৈচিত্র্য সংক্রান্ত তথ্যভাণ্ডার যা অনলাইনে পাওয়া যায়।

ডিজিটাল যুগের বিশ্বকোষগুলি শুধুমাত্র তথ্যের উৎস নয় বরং শিক্ষার, গবেষণার এবং দৈনন্দিন জীবনের বিভিন্ন কাজের জন্য অপরিহার্য মাধ্যম হয়ে উঠেছে। এটি আমাদেরকে তথ্যের সহজ এবং দ্রুত অ্যাক্সেস দেয়, যা আমাদের জীবনকে আরও সহজ এবং তথ্যসমৃদ্ধ করে তুলছে।

বিশ্বকোষের ব্যবহার এবং গুরুত্ব

বিশ্বকোষ একটি সংকলন যা বিভিন্ন বিষয়ের উপর ব্যাপক তথ্য সরবরাহ করে। এটি একটি বা একাধিক খণ্ডে বিভক্ত এবং বিভিন্ন বিষয়ের উপর প্রবন্ধ ও নিবন্ধ সম্বলিত হয়। বিশ্বকোষের ব্যবহার এবং গুরুত্ব বিভিন্ন দিক থেকে আলোচনা করা যায়:

ব্যবহার:

  1. তথ্য সংগ্রহ:
    • শিক্ষার্থীদের জন্য: বিশ্বকোষ শিক্ষার্থীদের বিভিন্ন বিষয়ের উপর তথ্য সংগ্রহ করতে সহায়তা করে, যা তাদের পড়াশোনা এবং গবেষণার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
    • সাধারণ পাঠকের জন্য: সাধারণ পাঠকেরা বিভিন্ন বিষয়ের উপর প্রাথমিক জ্ঞান লাভ করতে এবং তাদের জ্ঞান বাড়াতে বিশ্বকোষ ব্যবহার করতে পারে।
  2. গবেষণা এবং রেফারেন্স:
    • গবেষকদের জন্য: বিশ্বকোষ গবেষণা কাজের জন্য প্রাথমিক তথ্য সরবরাহ করে, যা আরও গভীর গবেষণার ভিত্তি তৈরি করে।
    • লেখকদের জন্য: বিভিন্ন বিষয়ে লেখা তৈরি করতে লেখকরা বিশ্বকোষের তথ্য ব্যবহার করতে পারেন।
  3. শিক্ষাদান:
    • শিক্ষকদের জন্য: শিক্ষকরা শিক্ষাদানের সময় বিভিন্ন তথ্য এবং উদাহরণ দিতে বিশ্বকোষ ব্যবহার করতে পারেন।
    • শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের জন্য: স্কুল, কলেজ, এবং বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে শিক্ষার মান উন্নত করতে বিশ্বকোষ ব্যবহৃত হয়।

গুরুত্ব:

  1. বিশ্বস্ত তথ্যের উৎস: বিশ্বকোষ সাধারণত নির্ভরযোগ্য এবং প্রামাণিক তথ্য সরবরাহ করে, যা বিভিন্ন বিষয়ে সঠিক ও বস্তুনিষ্ঠ জ্ঞান অর্জনে সহায়ক।
  2. জ্ঞান বিস্তার: এটি বিভিন্ন বিষয়ের উপর বিস্তৃত এবং বিস্তারিত তথ্য প্রদান করে, যা পাঠকদের জ্ঞান বৃদ্ধিতে সহায়তা করে।
  3. প্রাতিষ্ঠানিক প্রয়োজন: শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, গবেষণা কেন্দ্র এবং পাবলিক লাইব্রেরিতে বিশ্বকোষ একটি অপরিহার্য উপকরণ। এটি শিক্ষার্থী, শিক্ষক, এবং গবেষকদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ তথ্য সরবরাহ করে।
  4. ঐতিহাসিক এবং সাংস্কৃতিক মূল্য: বিশ্বকোষ একটি নির্দিষ্ট সময়ের সমাজ, সংস্কৃতি, বিজ্ঞান, এবং প্রযুক্তির ওপর আলোকপাত করে। এটি ঐতিহাসিক ও সাংস্কৃতিক মূল্যবান দলিল হিসেবে কাজ করে।
  5. আন্তর্জাতিক ব্যবহার: বিশ্বকোষ বিভিন্ন ভাষায় এবং সংস্কৃতিতে উপলব্ধ থাকায়, এটি আন্তর্জাতিক স্তরে জ্ঞান ভাগাভাগিতে সহায়ক।

সুতরাং, বিশ্বকোষ বিভিন্ন দিক থেকে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং এটি আমাদের দৈনন্দিন জীবনে এবং শিক্ষাজীবনে একটি অপরিহার্য উপাদান হিসেবে বিবেচিত হয়।

পরিশেষে, বিশ্বকোষ মানব সভ্যতার একটি অমূল্য সম্পদ। এটি জ্ঞানের সংরক্ষণ এবং বিতরণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। প্রাচীন যুগ থেকে শুরু করে ডিজিটাল যুগ পর্যন্ত এর বিবর্তন মানব সভ্যতার বিকাশে অগ্রণী ভূমিকা রেখেছে। বিশ্বকোষের ভবিষ্যৎ কেবলমাত্র প্রযুক্তির বিকাশের সাথে সাথে আরো উন্নত এবং ব্যাপকতর হবে।



About author

saikat mondal

Welcome to www.banglashala.com. Banglashala is a unique address for Bengali subjects. banglashala is an online learning platform for Bengalis. So keep learning with us




Leave a Reply

four × 2 =