বঙ্গবন্ধুর ৭ই মার্চের ভাষণ ও ৭ই মার্চের লিখিত ভাষণ সংক্ষিপ্ত

ইতিহাস রাষ্ট্রবিজ্ঞান

বাংলাদেশের ইতিহাসে ঐতিহাসিক ৭ মার্চের ভাষণের গুরুত্ব ও তাৎপর্য অপরিসীম। বঙ্গবন্ধুর এ ভাষণ পৃথিবীর সর্বকালের শ্রেষ্ঠ ভাষণ হিসেবে বিবেচনা করা হয়। ঐতিহাসিক এ ভাষণের গুরুত্ব নিম্নরূপ :
১. যুদ্ধের আহ্বান (Call for war) : বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ভাষণে উল্লেখিত “প্রত্যেক ঘরে ঘরে দূর্গ গড়ে তোল। তোমাদের যা কিছু আছে তাই নিয়ে শত্রুর মোকাবিলা করতে হবে।” এ লাইনগুলো ছিল কৌশলে দেশের সাধারণ মানুষকে যুদ্ধের ইঙ্গিত প্রদান করা এবং যুদ্ধের আহবান জানানো ।
২.বাঙালি জাতীয়তাবাদের বিকাশ (Development of Bengali Nationalism) : উল্লেখিত ভাষণটি বাঙালি জাতীয়তাবাদ বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। মূলত এ ভাষণের মধ্য দিয়ে বাঙালিকে সাহস ও শক্তি যুগিয়েছেন যা স্বাধীন বাংলাদেশ সৃষ্টিতে সহায়তা প্রদান করেছিল ।
৩.স্বাধীনতার ঘোষণাপত্র (Declaration of independence) : তৎকালীন সঙ্কটপূর্ণ পরিস্থিতিতে জাতির জনক বঙ্গবন্ধুর নির্দেশিত পথেই দেশ চলতে থাকে । বাঙালি জাতি শান্তিপূর্ণভাবে অসহযোগ আন্দোলনের নির্দেশাবলি মেনে চলছিল । এমনি এক সময়ে বঙ্গবন্ধু তার এ ভাষণের মধ্য দিয়ে মূলত স্বাধীনতার ঘোষণা দেন। তার ভাষণে উল্লেখিত “এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম” বক্তব্যে মূলত স্বাধীনতার ঘোষণারই ইঙ্গিত ছিল ।

২৬ মার্চের স্বাধীনতার ঘোষণা ও বাংলাদেশের স্বাধীনতার ঘোষণাপত্র কবে গৃহীত হয়

অসহযোগ আন্দোলনের সাফল্যের গতিধারাকে আরও বেশি জোরদার করার জন্য এবং আন্দোলনের ভবিষ্যৎ কর্মসূচি ঘোষণা করার মানসে আওয়ামীলীগ ১৯৭১ সালের ৭ মার্চ রেসকোর্স ময়দানে (বর্তমান সোহরাওয়ারদি উদ্যান) এক জনসভার আয়োজন করে।

ঐতিহাসিক ৭ই মার্চের ভাষণ (রেসকোর্স ময়দান)

সেই ঐতিহাসিক জনসভায় বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের উদ্বাত্তকণ্ঠে যে ঘোষণা প্রদান করেন তা বাঙালি জাতির ইতিহাসে স্মরণীয় ও সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ ভাষণ হিসেবে খ্যাত। ভাষণটি নিম্নরূপঃ

বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের (১৯৭১) ঐতিহাসিক ভাষণ (টেপ রেকর্ড থেকে লিপিবদ্ধ)

“আজ দুঃখ ভারাক্রান্ত মন নিয়ে আপনাদের সামনে হাজির হয়েছি। আপনারা সকলে জানেন এবং বোঝেন আমরা আমাদের জীবন দিয়ে চেষ্টা করেছি। কিন্তু দুঃখের বিষয় আজ ঢাকা, চট্টগ্রাম, খুলনা, রাজশাহী, রংপুরে আমার ভাইয়ের রক্তে রাজপথ রঞ্জিত হয়েছে। আজ বাংলার মানুষ মুক্তি চায়, বাংলার মানুষ বাঁচতে চায়, বাংলার মানুষ অধিকার চায়।কি অন্যায় করেছিলাম? নির্বাচনের পরে বাংলাদেশের মানুষ সম্পূর্নভাবে আমাকে ও আওয়ামীলীগকে ভোট দেন। আমাদের ন্যাশনাল এসেমব্লি বসবে, আমরা সেখানে শাসনতন্ত্র তৈরী করব এবং এদেশের ইতিহাসকে গড়ে তুলব। এদেশের মানুষ অর্থনীতি, রাজনীতি ও সাংস্কৃতিক মুক্তি পাবেন। কিন্তু দুঃখের সঙ্গে বলছি বাংলাদেশের করুন ইতিহাস,বাংলার মানুষের রক্তের ইতিহাস-এই রক্তের ইতিহাস মুমূর্ষু মানুষের করুণ আর্তনাদ-এদেশের করুণ ইতিহাস,এদেশের মানুষের রক্তে রাজপথ রঞ্জিত করার ইতিহাস ।

১৯৫২ সালে আমরা রক্ত দিয়েছি। ১৯৫৪ সালে নির্বাচনে জয় লাভ করেও আমরা গদিতে বসতে পারিনি। ১৯৫৮ সালে আইয়ুব খাঁ মার্শাল-ল জারী করে ১০ বছর আমাদের গোলাম করে রেখেছে। ১৯৬৬ সালে ৬ দফা আন্দোলনের সময় আমাদের ছেলেদের গুলি করে হত্যা করা হয়েছে। ১৯৬৯ সালের আন্দোলনে আইয়ুব খাঁর পতনের পর ইয়াহিয়া এলেন। ইয়াহিয়া খান সাহেব বললেন দেশে শাসনতন্ত্র দেবেন-আমরা মেনে নিলাম। তারপর অনেক ইতিহাস হয়ে গেল, নির্বাচন হল। প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খান সাহেবের সঙ্গে দেখা করেছি। আমি, শুধু বাংলার নয়, পাকিস্তানের মেজরিটি পার্টির নেতা

হিসেবে তাকে অনুরোধ করেছিলাম ১৫ ই ফেব্রুয়ারি তারিখে আমাদের জাতীয় পরিষদের অধিবেশন দিতে । তিনি আমার কথা রাখলেন না,রাখলেন ভুট্টো সাহেবের কথা। তিনি বললেন,মার্চ মাসে প্রথম সপ্তাহে সভা হবে।আমি বললাম ঠিক আছে, আমরা এসেমব্লিতে বসব। আমি বললাম, এসেমব্লির মধ্যে আলোচনা করবো- এমনকি এ পর্যন্তও বললাম,যদি কেউ ন্যায্য কথা বলে,আমরা সংখ্যায় বেশী হলেও একজনের মতেও যদি তা ন্যায্য কথা হয়,আমরা মেনে নেব ।

ভুট্টো সাহেব এখানে ঢাকায় এসেছিলেন,আলোচনা করলেন। বলে গেলেন আলোচনার দরজা বন্ধ নয়,আরও আলোচনা হবে। তারপর অন্যান্য নেতাদের সঙ্গে আমরা আলোচনা করলাম- আলাপ করে শাসনতন্ত্র তৈরি করব-সবাই আসুন বসুন। আমরা আলাপ করে শাসনতন্ত্র তৈরি করবো। তিনি বললেন, পশ্চিম পাকিস্তানের মেম্বার যদি আসে তাহলে কসাইখানা হবে এসেমব্লি। তিনি বললেন, যে যে যাবে তাদের মেরে ফেলে দেওয়া হবে, যদি কেউ এসেমব্লিতে আসে পেশোয়ার থেকে করাচী পর্যন্ত জোর করে বন্ধ করা হবে। আমি বললাম, এসেমব্লি চলবে । আর হঠাৎ ১ তারিখ এসেমব্লি বন্ধ করে দেওয়া হল ।

ইয়াহিয়া খান প্রেসিডেন্ট হিসেবে এসেমব্লি ডেকেছিলেন ।আমি বলালাম, আমি যাব। ভুট্টো বললেন,যাবেন না। ৩৫ জন সদস্য পশ্চিম পাকিস্তান থেকে এখানে এলেন। তারপর হঠাৎ বন্ধ করে দেওয়া হল, দোষ দেওয়া হল বাংলার মানুষের, দোষ দেওয়া হল আমাকে । দেশের মানুষ প্রতিবাদ মুখর হয়ে উঠল।

আমি বললাম, আপনরা শান্তিপূর্ণ ভাবে হরতাল পালন করুন।আমি বললাম, আপনারা কল কারখানা সব কিছু বন্ধ করে দিন।জনগন সাড়া দিল ৷ আপন ইচ্ছায় জনগণ রাস্তায় বেরিয়ে পড়ল, সংগ্রাম চালিয়ে যাবার জন্য প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হল । আমি আমরা জামা কেনার পয়সা দিয়ে অস্ত্র পেয়েছি বহিঃশত্রুর আক্রমণ থেকে দেশকে রক্ষা করবার জন্য, আজ সেই অস্ত্র ব্যবহার হচ্ছে। আমার দেশের গরীব-দুঃখী মানুষের বিরুদ্ধে। তার বুকের উপর হচ্ছে গুলি ।আমরা পাকিস্তানে সংখ্যাগুরু-আমরা বাঙালিরা যখনই ক্ষমতায় যাবার চেষ্টা করেছি তখনই তারা আমাদের উপর ঝাঁপিয়ে পড়েছে।

আমি বলেছিলাম,জেনারেল ইয়াহিয়া খান সাহেব,আপনি পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট, দেখে যান কিভাবে আমার গরীবের উপর, আমার বাংলার মানুষের বুকের উপর গুলি করা হয়েছে। কিভাবে আমার মায়ের কোল খালি করা হয়েছে,কি করে মানুষকে হত্যা করা হয়েছে,আপনি আসুন,আপনি দেখুন। তিনি বললেন, আমি ১০ তারিখে রাউন্ডটেবিল কনফারেন্স ডাকবো ।

আমি বলেছি, কিসের এসেমব্লি বসবে;কার সঙ্গে কথা বলব?আপনারা আমার মানুষের বুকের রক্ত নিয়েছেন, তাদের সাথে কথা বলব? পাঁচ ঘণ্টার গোপন বৈঠকে সমস্ত দোষ তারা আমাদের উপর, বাংলার মানুষের উপর দিয়েছেন । দায়ী আমরা!

২৫ তারিখে এসেমব্লি ডেকেছে। রক্তের দাগ শুকায় নাই। ১০ তারিখে বলেছি, রক্তে পাড়া দিয়ে, শহীদের উপর পাড়া দিয়ে,এসেমব্লি খোলা চলবে না। সামরিক আইন মার্শাল-ল Withdraw করতে হবে। সমস্ত সামরিক বাহিনীর লোকদের ব্যারাকের ভিতর ঢুকতে হবে। যে ভাইদের হত্যা করা হয়েছে তাদের তদন্ত করতে হবে।আর জনগণের প্রতিনিধির কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর করতে হবে। তারপর বিবেচনা করে দেখব আমরা এসেমব্লিতে বসতে পারবো কি পারবো না। এর পূর্বে এসেমব্লিতে আমরা বসতে পারি না ।

আমি প্রধানমন্ত্রীত্ব চাই না । দেশের মানুষের অধিকার চাই। আমি পরিষ্কার অক্ষরে বলে দিবার চাই যে, আজ থেকে এই বাংলাদেশের কোর্ট কাচারি, আদালত ফৌজদারি, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ থাকবে। গরীবের যাতে কষ্ট না হয়, যাতে আমার মানুষ কষ্ট না করে সেজন্য যে সমস্ত অন্যান্য জিনিসগুলি আছে,সেগুলির হরতাল কাল থেকে চলবে না। রিক্সা, গরুরগাড়ি, রেল চলবে- শুধু সেক্রেটারিয়েট, সুপ্রিমকোর্ট, হাইকোর্ট, জজকোর্ট, সেমি গভর্নমেন্ট দপ্তর, ওয়াপদা কোন কিছু চলবে না। ২৮ তারিখে কর্মচারীরা গিয়ে বেতন নিয়ে আসবে। এরপর যদি বেতন দেওয়া না হয়, এরপর যদি একটি 1 চলে,এরপর যদি আমার লোককে হত্যা করা হয় । তোমাদের কাছে অনুরোধ রইল, প্রত্যেক ঘরে ঘরে দুর্গ গড়ে তোল । তোমাদের যা কিছু আছে তাই নিয়ে শত্রুর মোকাবেলা করতে হবে এবং জীবনের তরে রাস্তাঘাট যা যা আছে সব কিছু আমি যদি হুকুম দিবার নাও পারি,তোমরা বন্ধ করে দেবে। আমরা ভাতে মারবো, আমরা পানিতে মারবো। সৈন্যরা তোমরা আমার ভাই, তোমরা ব্যারাকে থাকো, তোমাদের কেউ কিছু বলবে না। কিন্তু আর তোমরা গুলি করবার চেষ্টা করো না। সাত কোটি মানুষকে দাবায়ে রাখতে পারবা না। আমরা যখন মরতে শিখেছি, তখন কেউ আমাদের দাবায়ে রাখতে পারব না।

আর যে সমস্ত লোক শহীদ হয়েছে, আঘাতপ্রাপ্ত হয়েছে, আমরা আওয়ামীলীগ থেকে যদ্দুর পারি সাহায্য করতে চেষ্টা করবো। যারা পারেন আওয়ামীলীগ অফিসে সামান্য টাকা-পয়সা পৌঁছে দেবেন। আর ৭ দিন হরতালে শ্রমিক ভাইয়েরা যোগদান করেছে, প্রত্যেক শিল্পের মালিক তাদের বেতন পৌঁছে দেবেন। সরকারি কর্মচারীদের বলি, আমি যা বলি তা মানতে হবে। শুনুন, মনে রাখুন শত্রু পিছনে ঢুকেছে,নিজেদের মধ্যে আত্মকলহ সৃষ্টি করবে, লুটতরাজ করবে। এই বাংলায় হিন্দু মুসলমান যারা আছে আমাদের ভাই,বাঙালি,অ বাঙালি তাদের রক্ষা করার দায়িত্ব আমাদের উপর, আমাদের যেন বদনাম না হয় । মনে রাখবেন কর্মচারীরা, রেডিও যদি আমাদের কথা না শোনে তাহলে কোন বাঙালি রেডিও ষ্টেশনে যাবে না। যদি টেলিভিশন আমাদের নিউজ না দেয়, তাহলে টেলিভিশনে যাবেন না। ২ ঘণ্টা ব্যাংক খোলা থাকবে, যাতে মানুষ তাদের মাইনেপত্র নিতে পারে । পূর্ব বাংলা থেকে পশ্চিম পাকিস্তানে এক পয়সাও চালান হতে পারবে না। টেলিফোন, টেলিগ্রাম আমাদের এই পূর্ব বাংলায় চলবে এবং বাংলাদেশের নিউজ বাইরে পাঠানো চলবে ।

এই দেশের মানুষকে খতম করবার চেষ্টা চলছে-বাঙালিরা বুঝে সুঝে কাজ করবেন। প্রত্যেক গ্রামে, প্রত্যেক মহল্লায় আওয়ামীলীগের নেতৃত্বে সংগ্রাম পরিষদ গড়ে তুলুন এবং আমাদের যা কিছু আছে,তাই নিয়ে প্রস্তুত থাকুন। রক্ত যখন দিয়েছি আরও রক্ত দেব। এই দেশের মানুষকে মুক্ত করে তুলবো ইনশাআল্লাহ। এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম। জয় বাংলা।”৯

উল্লেখিত ভাষণে তিনি ২৫ মার্চ জাতীয় পরিষদের অধিবেশনের আগেই বাস্তবায়নের জন্য চার দফা দাবি পেশ করেন:

অবিলম্বে মার্শাল ল’ প্রত্যাহার করতে হবে ।
সামরিক বাহিনীকে ব্যারাকে ফিরে যেতে হবে।
নিহত ব্যক্তিদের সঠিক সংখ্যা অনুসন্ধান করতে হবে।
২৫ শে মার্চে জাতীয় পরিষদের অধিবেশনের আগে নির্বাচিত প্রতিনিধিদের হাতে ক্ষমতা হস্তান্তর করতে হবে।

তিনি বলেন, উপরোক্ত শর্তগুলো পালিত হলেই কেবল তিনি চিন্তা করে দেখবেন জাতীয় পরিষদে যোগ দেবেন কি না। ২ মার্চে ঘোষিত অসহযোগ আন্দোলন ৭ মার্চের ভাষণের পর তীব্র আকার ধারন করে। মূলত এ ভাষণের মধ্য দিয়ে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বাংলাদেশের স্বাধীনতারই ঘোষণা দেন।



About author

saikat mondal

Welcome to www.banglashala.com. Banglashala is a unique address for Bengali subjects. banglashala is an online learning platform for Bengalis. So keep learning with us




Leave a Reply

6 + 15 =